” রাজনৈতিক সংলাপ ফলপ্রসূ হবে কিনা?

সংলাপকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে নতুন মোড়ের সৃষ্টি। নানা ধরনের শঙ্কা-অনিশ্চয়তার মধ্যেও রাজনীতির মাঠের শেষপ্রান্তে যেন আলোকবিন্দু দেখা যাচ্ছে। সফলতা নিয়ে তর্কবির্তক ও শঙ্কা থাকলেও বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে একটি সম্ভাবনার পথ তৈরি হয়েছে। আর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যের সংলাপের আহ্বানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাড়ায়। যে কারণে দেশবাসী তাকিয়ে রয়েছে বহুল প্রত্যাশিত সংলাপের দিকে। আজ বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) সবার নজর থাকছে গণভবনের দিকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সংলাপ হয়েছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব সংলাপ তেমন একটা ফলপ্রসূ হয়নি। এতদিন বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারকে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও সরকার সেসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার পক্ষ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ সাত দফা দাবিতে সরকারকে আলোচনায় বসার জন্য রবিবার (২৯ অক্টোবর) চিঠি দেওয়া হয়। এরপর (মঙ্গলবার, ৩০ অক্টোবর) সকালে সংলাপে বসার সম্মতি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেনকে চিঠি দেন। আজ বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যা সাতটায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

ঐক্যজোটের সাত-দফার মধ্যে কয়েকটি দফা আছে যা সংবিধান সম্পর্কিত। দুই-একটি আছে আইন-আদালতের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর দুই-একটি আছে নির্বাচন কমিশন সম্পর্কিত। আলোচনায় বসলে অবশ্যই কোনো না কোনো উপায় বের হয়ে আসবে।
তাদের পাঁচ দফায় সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবি আছে নির্বাচনের আগে। শেখ হাসিনার পক্ষে এটা মানার কোনও সুযোগ নেই। কারণ, সংবিধানে সে সুযোগ নেই। আর শেখ হাসিনা আগেই বলে দিয়েছেন, নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। আর নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের বিধানও সংবিধানে নেই। তাই সেটাও মানার কোনও সুযোগ শেখ হাসিনার নেই।

ঐক্যজোট দাবি সরকারে দায়িত্বপ্রাপ্তরা নির্বাচন করতে পারবে না। পৃথিবীর সব সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা নির্বাচন করেন। তাই এ দাবির কোনও ভিত্তি নেই। অন্যদিকে তারা নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন চান। সার্চ কমিটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। এখানে বিএনপি, গণফোরাম বা আওয়ামী লীগ কারও কিছু করার নেই। এটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। এছাড়া তাদের আরও একটি দাবি আছে নির্বাচনের আগে ও পরে ১০ দিন সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত রাখা নির্বাচনি কাজে। এই দাবি মানতে হলে সংসদে নতুন করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। এটা তাই আগামী সংসদে আলাপ-আলোচনা হতে পারে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রথম দাবিতে খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রসঙ্গ রয়েছে। কিন্তুু এই দাবি সরকার সাড়া দেবে না হয়ত। বলবে এটা আদালতের বিষয়। খালেদা জিয়া ইস্যুতে এই দ্বিমুখি চাপে যখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা আসবে তখন নির্বাচনে জন্য সে আলোচনা এগুতে পারে। কারণ – নবগঠিত এই জোটের প্রধান উদ্দেশ্য খালেদা জিয়ার মুক্তি নয়, এই উদ্দেশ্য অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন।

শেষ পর্যন্ত ড.কামাল হোসেন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি ছাড় দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়তে পারে বিএনপি; নির্বাচন বর্জনের সিদ্বান্তেও যেতে পারে। কারণ নেতৃত্ব হারাতে পারেন খালেদা-তারেক জিয়া। কমিটির সদস্যপদের অযোগ্যতা’ শীর্ষক ৭ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করে বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্র গ্রহণ না করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বুধবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মাদ আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন আদালতের এই আদেশের ফলে ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দলীয় নেতৃত্ব হারাতে পারেন। নির্বাচনে তাদের দলীয় মনোনয়নও দেয়ার সুযোগ থাকছে না।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংলাপের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এর সফলতা নেই বললেই চলে। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৬ সালের ২২ জানুয়ারি, এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৪ সালের এপ্রিল ও ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর সংলাপের উদ্যোগ হলেও এর প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথের তৎকালীন মহাসচিব এনিয়াওকুর এমেকা ও তার বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ানের মধ্যস্থতায় সংলাপ হলেও ওই সময়ের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছিল। এছাড়া ২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল তিন সপ্তাহব্যাপী ছয় দফা বৈঠক করলেও সমঝোতা হয়নি। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের শেষ দিকে নির্বাচন নিয়ে সংকট নিরসনে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে সরাসরি ফোন দিয়ে সংলাপের আমন্ত্রণ জানালে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। পরে বিএনপির বর্জনের মধ্য দিয়ে দেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
সুষ্ঠু সংলাপ মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সব আইন নির্বাচন কমিশনের হাতে রয়েছে। কমিশনকে সেই আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে সক্ষম হতে হবে। সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সরকারকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেই আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সংলাপ হয়েছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব সংলাপ তেমন একটা ফলপ্রসূ হয়নি। ‘অতীতে সফল হয়েছে কী হয়নি, সেদিকে না তাকানোই ভালো। আমরা আশা করি যেকোনও সংকট আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা জরুরি। তাই এবারের সংলাপ বা আলোচনা ফলপ্রসূ হবে কিনা সেই ভবিষ্যৎবাণী না করি। উভয়পক্ষ সংলাপে বসছে। আলোচনা হোক। সফল হোক সেটাই আমরা সকলে চাই।

লেখক : রফিকুল ইসলাম জসিম
সাংবাদিক ও সমাজকর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Shares