” ৭ নভেম্বর নিয়ে এখনো চলছে বির্তক”

সত্তরের দশকের মাঝমাঝি সময় থেকে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে নানা সময় বিভিন্নভাবে সেনা-অভ্যুত্থান ঘটনা ঘটেছিল। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ এবং সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীর একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহন সেই সময়ে ঘটে চলেছিল নিয়মিতভাবেই। কিছুকিছু দিন আছে, যা নিয়ে জন-আলোচনার শেষ নেই। তেমনই একটি দিন হলো ৭ নভেম্বর।

আজকের দিনটি ঘিরে এখনো চলছে বির্তক । কেননা, ওই দিনে যা ঘটে গিয়েছিল স্থায়ী ছাপ। ঘটনাবলির পক্ষ-বিপক্ষ ছিল। এখনো আছে। ৭ নভেম্বর নিয়ে মোটামুটি তিনটি পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। (এক) পক্ষ দিনটি মহাসমারোহে সিপাহি -জনতার অভ্যুত্থান দিবস ” হিসাবে পালন করে। অন্য একটি পক্ষ পালন করে” বিপ্লব ও সংহতি দিবস ” আবার অনেকের কাছেই দিনটির তাৎপর্য হলো মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস হিসাবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি আটকে পড়া বা থেকে যাওয়া বাঙালি সেনা সদস্যদের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গ্রহন করা হলে মুক্তিযোদ্ধা আর পাকিস্তান – প্রত্যাগত অফিসারদের মধ্যে দুরুত্ব তৈরি হয়েছিল।

মুক্তিযোদ্ধে অংশগ্রহনকারী সেনা অফিসারদের দুই বছরের সিনিয়রিটি দেওয়া হয় যার কারণে মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা চাকুরিতে পাকিস্তান প্রত্যাগতদের চেয়ে অনেক এগিয়ে যান।পাকিস্তান- প্রত্যাগতরা এ ব্যাপারে অসন্তুষ্ট ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের অধিনায়ক মেজর মো. আবদুল জলিল সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে জাসদে যোগ দিয়েছিল সেনাছাউনি গুলোতে সৈনিকদের সংগঠন গড়ে তোলার কাজটি তিনিই শুরু করেন। সশস্ত্র বাহিনীর নন কমিশন্ড ও জনিয়র কমিশন্ড অফিসাররাই ছিলেন মাঠ পর্যায়ের সংগঠন।

১৭ মার্চ ১৯৭৪, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম মনসুর আলীর বাড়ির সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে মেজর জলিল সহ কয়েকজন জাসদ নেতা গ্রেপ্তার হন। জেল থেকে চিঠি পাঠিয়ে জলিল সামরিক বাহিনীতে যাঁরা সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের লে. কর্ণেল (অব.)আবু তাহেরর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলেন। ১৯৭৩ সাল থেকেই জাসদ নেতৃত্ব একটা বিল্পবী পাটি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করে। এরই ধারাবাহিতায় চুয়াত্তরের জুনে গণবাহিনী তৈরির সিদান্ত নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি চলছিল বিল্পবী সৈনিক সংস্থার কার্যক্রম।

পঁচাত্তরে ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত সেনাবাহিনীর কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের প্রায় সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে যুক্ত অফিসার মেজর ফারুকের কথায় জানা যায়, সরকার উৎখাতের পরিকল্পনার কথা তিনি
সে বছর মার্চ মাসেই সেনাবাহিনী তৎকালীন উপ-প্রধান জেনারেল জিয়াকে জানিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত অফিসারদের বিরুদ্ধে ১৯৭৫ সালে নভেম্বর মাসে অবস্থান নিয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে সেনা ও বিমানবাহিনীর একদল মুক্তিযোদ্ধা অফিসার। তখন তারা সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াকে বন্দিও করেন। কিন্তু সে সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসার জিয়ার পক্ষেই ছিলেন এবং তারা খালেদ -শাফায়াতকে সক্রিয়ভাবেই সমর্থন করেননি।

৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীর গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের কারণে মোশতাক -জিয়া চক্রের বিরুদ্ধে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়। অসামরিক নেতৃত্বে কোনো রাজনৈতিক সরকার যাতে গঠিত না হতে পারে সে জন্য চারজন জাতীয় নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়।

পরে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহেরর নেতৃত্বাধীন গোপন সেনা সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার মাধ্যমে খালেদ মোশারফ শাফায়াত জামিল বিরুদ্ধে আরেকটি সেনা অভ্যুত্থান মাধ্যমে জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করা হয়।

রাত ১২ টায় শুরু হয় অভ্যুত্থান। ঢাকার রাস্তার সেনাবাহিনীর ট্যাংক-লরি ইতস্তত ঘোরাফেরা করতে থাকে। আমজনতার পথের পাশে দাঁড়িয়ে উল্লাস করে, হাততালি দেয় এবং অনেকে জীবনে প্রথমবারের মতো ট্যাংকে বা সেনাবাহিনীর ট্রাকে চড়ে ঢাকার রাস্তার ঘরে বেড়ান। জেনারেল জিয়া জানতেন, ওই সময় ক্ষমতার নিয়ামক হলো সেনাবাহিনী এবং তিনি নিজের অবস্থান মজবুত করে ফেললেন। জিয়াপন্থীদের কাছে ৭ নভেম্বর হলো “বিপ্লব ও সংহতি’র প্রতীক।

সিপাহি বিপ্লবের নামে তিনজন স্বনামধন্য মুক্তিযোদ্ধাকে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর হত্যা করা হয়েছিল। এরা হলেন, খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম), কে এন হুদা (বীর উত্তম), এ টি এম হায়দার (বীর বিক্রম)। সেদিন সকালে তারা তিনজনই ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের হেডকোয়ার্টার্সে অবস্থান করছিলেন, যখন হাত মেলানোর দূরত্ব থেকে কোম্পানি কমান্ডার আসাদ ও জলিল তাদের গুলি করে হত্যা করেছিল। তথাকথিত সিপাহি বিপ্লব নামে এই হত্যাকান্ড তিনজনই ছিলেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস হিসাবে পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে তা শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি পেয়েছিল। অবশেষে ১৯৮১ সালের ৩০ মে এ ধরনেরই একটি সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান নিজেই নিহত হয়েছিল। তার হত্যার পর মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা অথবা নিয়মবহিভর্‚ত অন্যায় বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। এভাবে সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করলে স্বাধীন বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জনমনে সচেতনতা জাগ্রত হবে।

রফিকুল ইসলাম জসিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Shares