ক্ষমতার জন্য তারেক জিয়া কি রক্তের হোলি খেলবেন!

অনেক দেশের মত আমাদের দেশে অনলাইন পত্রিকার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে নাগরিক সাংবাদিকতা। এর ফলে স্বপ্রণোদিত হয়ে গণমানুষের বা আম-জনগণের খবর ও তথ্য সংগ্রহ, পরিবেশন, বিশ্লেষণ এবং প্রচারে অংশগ্রহণ করছেন কোটি কোটি মানুষ। এটাই সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতা। এই নাগরিক সাংবাদিকতা এখন বিএনপি-জামায়াত তথা আইএসআই এর প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতা দখলে তারেকের শেষ চেষ্টার বিপরীতে।

এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় যে বিপ্লব ঘটে চলেছে, তাতে মানুষ আর সংবাদ-এর জন্য রাষ্ট্র, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া সুবিধাবাদীদের রাজনৈতিক দলের মিথ্যাচারে নিয়োজিত পলিটিক্যাল কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট দুনিয়া নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম-এর উপর আগের মতো নির্ভরশীল নন। মানুষ নিজেই এখন সংবাদ জোগাড়, তৈরি ও পরিবেশনের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে শুরু করেছেন। তাঁরা এখন বেছে বেছে সেই সংবাদ ও তথ্য তুলে ধরছে, অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা রাষ্ট্র ও কর্পোরেট দুনিয়ার পছন্দ তো নয়ই, অনেক সময়ই তা সরকার, সুবিধাবাদীদের রাজনৈতিক দল ও কর্পোরেট দুনিয়ার স্বার্থের বিপরীত। কেন এই কথার অবতারণা তা বলার জন্য একটু পিছনে ফিরে দেখতে পারি, যার সাথে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনার একটা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

১৫ বছর আগে ইরাকে আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির তৎকালীর প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে ২০০৩ সালের ২০ মার্চ হামলা চালানো হয়। কিন্তু ১৫ বছর পরে এসে ইরাকে এ আগ্রাসনকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভুল বলে মনে হচ্ছে। মার্কিন সৈন্যরা সরাসরি ইরাকে না ঢুকে ইরাকের রিপাবলিকান গার্ডের মধ্য থেকে কোন বেঈমানকে তারা টাকা দিয়ে কেনার জন্য বাগদাদ সীমান্তে ৩ দিন অপেক্ষা করে। পরে ইরাকের রিপাবলিকান গার্ডের প্রধান বেঈমান হিসেবে মার্কিন সৈন্যের খাতায় নাম লেখায়। এর পরেই তুমুল আক্রমণে ইরাক ধ্বংস করা হয়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীসহ সে দেশের বুদ্ধিজীবীগণ এখন বলা শুরু করেছেন যে, বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে, উন্নয়নের সব দিক থেকেই। কেউ কেউ বাংলাদেশকে তাঁদের উন্নয়নের মডেল বানানোর দাবি তুলেছেন মিডিয়ায়। তা দেখে বাংলাদেশের অনেকেই পুলকিত হয়েছেন, কিন্তু আসলে কি তাই না অন্য কিছু। আমাদের ব্যক্তিজীবনে আমাদের চির শত্রু যখন আমদের প্রশংসা করে তার পরেই দেখি আমাদের বড় কোন ক্ষতি হয়। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত টুকরো টুকরো খবর পাশাপাশি সাজালে তা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া ঘটনার দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নিলে এই কথার পক্ষে যুক্তি মিলবে।

সময়ের আলোচিত নির্বাচন কমিশনার মাহাবুব তালুকদার। তিনি তাঁর মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন পাহাড়ী বিএনপি নেতা ওয়াদুদ ভুঁইয়ার সাথে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনার মাহাবুব তালুকদার ২০০৫ এ সরকারী চাকরী করার সময় এক মহিলা দর্শনার্থীকে শ্লীলতাহানির দায়ে ধরা পড়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন। দৈনিক সংবাদ-এ খবরটা সচিত্র প্রকাশিত হয়। পরে তাঁর জামাই ওয়াদুদ ভুঁইয়া তাঁকে সে সময় উদ্ধার করেন। তাই এখন তিনি বিএনপিকে তার প্রতিদান দিচ্ছেন। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কিত করার প্রথম বীজ বোপণ করেছেন, তাতে এখন পানি ঢালছেন, প্রতিনিয়ত।

এর পরে মধ্যপ্রাচ্যের এক নেতার সহায়তায় তারেক রহমান ৩০০ আসনেই আইএসআই মনোনীত জামাত-বিএনপির প্রার্থীকে মনোনয়ন দেন, তাঁদের দলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে। মনোনয়ন বঞ্চিতদের বলা হয় ক্ষমতায় এসে বাকীদের ক্ষমতার স্বাদ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হবে। তাঁর দলের অনেকেই একথা বিশ্বাস করেননি, তাই তারা হয় চুপ না হয় বিদ্রোহ করেছেন। কিন্তু কেন তারেক রহমান এই কথা বলেছেন কী তাঁর শক্তি! নির্বাচনের তারিখ ৩০শে ডিসেম্বর। শেষ ৭ দিনে তিনি নাকি চমক দেখাবেন। সে চমকের আলামত বা প্রমাণ ইতিমধ্যেই পাওয়া শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের কাছে হাতে লেখা বেনামি চিঠিতে ৩ দিনের সময় দিয়ে হুমকী দয়া হয়েছে, পার্সেল পাঠানো হয়েছে অনেককে, এটা কী গোয়েন্দাদের দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরানর চেষ্টা! তা না হলে হঠাৎ শনিবার গভীর রাতে যাত্রাবাড়িতে বাসে আগুন দিলো কারা! কে বা কারা কুমিল্লা-২ সংসদীয় আসনে (হোমনা-তিতাস) আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিমা আহমাদ নির্বাচনী জনসভায় যাওয়ার পথে বোমা হামলা চালালো! কে বা কারা নরসিংদীতে মুখোশ পরে নির্বাচনী ক্যাম্পে গুলি চালালো!

অন্যদিকে ড. কামালের একটা নির্বাচনী ভিডিও ভাইরাল করা হয়েছে বুস্টিং করে, তাতে ড. কামালকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে সবাইকে মুক্তির জন্য (!) বেরিয়ে আসার আহ্বান জানাতে দেখা গেছে। তিনি আবার হঠাৎ করে ঢাকার বাইরের সব আসনের নির্বাচন ফেলে রেখে আগামী ২৭ ডিসেম্বরে ঢাকায় ঐক্যফ্রন্টের জনসভায় সবাইকে যোগ দিতে কেন বলা হচ্ছে! তারা কি নির্বাচন বর্জন করবে! নাকি অন্য কিছু! নির্বাচন ফেলে অস্বাভাবিকভাবে ঢাকায় জনসভায় আসার মতলব কী তাঁদের! কিছু পরিকল্পনা বা চেষ্টা তাঁদের যে আছে তার কিছু ইঙ্গিত আগেই মিডিয়ায় খবর হয়েছে। বলা হয়েছে যে, ‘ভারতের অন্তত ৫টি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঠন আগামী ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন করছে। বিএনপির জন্য এরা অর্থ সহায়তা, অস্ত্র সরবরাহসহ নানারকম তৎপরতায় জড়িত। ‘র’ বলেছে, ‘এই সংগঠনগুলো মনে করছে বিএনপি জয়ী হলে তাদের সুবিধা হবে’। এরা কি এসময়েই ঢাকায় ঢুকবে, ঢাকা অচল করতে, নাকি ঢাকায় হৈ চৈ হবে আর সীমান্ত এলাকা দিয়ে চলবে হামলা, কোনটা! কারণ রাজশাহীর একজন সাবেক মেয়রের টেলিফোন বার্তা ফাঁস হয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেখানে তিনি বলেছেন ২৮ ডিসেম্বর আক্রমণের চূড়ান্ত তারিখ। ফলাফলও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন,‘হয় বাংলাদেশ থাকবে না হয় বাংলাদেশ বিভাজন হবে!

মফস্বল অঞ্চলের গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে যে, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত বেঈমান রাজনৈতিক নেতা যারা টাকা আর ক্ষমতার লোভে নিজ দলের নেতাদের হত্যায় জড়িত ছিল পরে দল পরিবর্তন করে গত ৫ বা ১০ বছরে আওয়ামী লীগ বনে গেছে; এমন একাধিক নষ্ট রাজনিতিকদের সাথে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যমে আত্মীয়তা বা টাকার সূত্রে যোগাযোগ হয়েছে। বিএনপি এমন লোকদের বেছে নিয়েছে যারা সারাদেশে আওয়ামী লীগের গ্রুপিংকে পুঁজি করে নৌকা বা আওয়মী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে এখন আওয়ামী লীগ নেতা হয়ে গেছেন। যাতে নির্বাচনী প্রচারণায় কেউ তাঁদের সন্দেহ না করে। তারা সুযোগ পেলে নৌকার ব্যাজ লাগিয়ে নির্বাচনকে বিতর্কিত করবে, অথবা নির্দেশ মোতাবেক হত্যাযজ্ঞ চালাতেও পিছপা হবে না। এদের অনেকেই পুলিশের খাতায় ওয়ান্টেড বা দাগী।

অন্যদিকে শনিবার রাতে আবার ড. জাফরুল্লা গতকাল এটিএন বাংলায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে বলেছেন যে, বঙ্গবন্ধুর আমলেই নাকি গোলাম আযমের ছেলেকে সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়া হয়! কী সাংঘাতিক মিথ্যাচার! একই সময়ে আরেক রাজাকার পুত্র আরেক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছেন যে, তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। কিন্তু আসল ঘটনা হচ্ছে-

১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর জাবরহাট হাইড আউটে থাকাকালে সালাহউদ্দিন খবর পান যে- তাঁর বাবাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ধরে নিয়ে গেছে। সেদিন রাতেই তিনি বাড়ির দিকে রওনা হন। দীর্ঘ ৭ মাস পর বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখে বুঝতে পারেন, কেউ তাঁকে মিথ্যা খবর দিয়ে বাড়ী এনেছে। সিদ্ধান্ত নেন, সারাদিন বাড়িতে লুকিয়ে থেকে রাতের বেলা রওনা হয়ে হাইড আউটে ফিরে যাবেন। সালাহউদ্দিন টেরও পাননি যে, ওঁৎ পেতে থাকা রাজাকাররা তাঁকে দেখে ফেলেছে। কিছুক্ষণ পরই একদল পাকিস্তানি সৈন্য আর কয়েকজন রাজাকার তাঁদের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। গ্রেফতার হন সালাহউদ্দিন! তাঁকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ঠাকুরগাঁও সদর ছাউনিতে নিয়ে যায় পাকিস্তানিরা। বিলু কবির তাঁর লেখা একটা বইতে এই কথা বিস্তারিত বলেছে। মুক্তিযোদ্ধা সালাউদ্দিনকে যে রাজাকার ধরিয়ে দিয়েছিল তার নাম হলো মওলানা তমিজ উদ্দিন। যে ১৯৭১ সালে ঠাকুরগাঁও মহকুমা সদরের পিস কমিটির সেক্রেটারি ছিল। সেই সালাউদ্দিনকে পাকিদের হাতে তুলে দেয়। এই তমিজ উদ্দিন স্থানীয় একটা মসজিদের ইমাম ছিল। সে বিএনপি বর্তমান মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের খুব পছন্দের লোক ছিল। ঐ বইতে (প্রামাণ্য সালাহউদ্দিন) আরো বলা আছে যে, মুক্তিযুদ্ধের ঐ সময় এক ঈদের নামাজের ইমামতিতে মওলানা তমিজ উদ্দিনের নাম উঠলে সংখ্যাগরিষ্ঠ নামাজী তার বিরোধিতা করলেও স্বাধীনতার পরে জেলে থাকা রাজাকার চখা মিয়ার ছেলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সমর্থনে মওলানা তমিজ উদ্দিন কোনমতে ঈদের নামাজ পড়ায়। সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক দাবি করেন! কি সাংঘাতিক মিথ্যাচারী এই মানুষরূপী ঘাতকটার!

তবে এতা সত্য যে যড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ার পরেও ষড়যন্ত্রকারী সফল হয়েছে এমন নজীর খুব কমই দেখা যায়।তবু সাবধান হতে দোষের কী! ক্ষমতার জন্য তারেক জিয়া যে রক্তের হোলি খেলতে পারেন ২১শে আগস্ট তাঁর জ্বলন্ত প্রমাণ।

©

তথ্যঋণঃ বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল, পুরাতন পত্রিকা, সোশ্যাল মিডিয়া, গোয়েন্দা সুত্র, ইত্যাদি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Shares