শবে বরাতে ইবাদত রোজা ও কবর জিয়ারত

হিজরি অষ্টম মাস শাবানের ‘লাইলাতুম মিন নিসফি শাবান’ খ্যাত ১৪তম রাতকে বলা হয় শবে বরাত। ভারতীয় উপমহাদেশে ধুমধামের সঙ্গে অর্ধ কিংবা রাতজুড়ে ইবাদত, হালুয়া-রুটি বিতরণ, গোনাহ মাফে গোসল, কবর জিয়ারতসহ আলোক সজ্জার মাধ্যমে পালিত হয় শবে বরাত।

শবে বরাত নিয়ে রয়েছে নানা মতপার্থক্য। শবে বরাত নিয়ে কেউ কেউ একেবারেই অতিরঞ্জিত করেন আবার কেউ কেউ একে একেবারেই ছেড়ে দেন, যা সাধারণ মানুষকে চরম বিভ্রান্তিতে ফেলে।

হাদিসের সনদ দুর্বল হোক আর মজবুত হোক এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে রয়েছে হাদিসের বর্ণনা। তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাতে নিজ ঘরে অবস্থান করে নফল ইবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত করেছেন। এক হাদিসে এসেছে-

হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে হিব্বান)

উল্লেখিত হাদিসের আলোকে এ রাতে শিরকমুক্ত থেকে পরস্পরের ঝগড়া-বিবাদ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ এসেছে। তাতে আল্লাহ তাআলা এ রাতে বান্দাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেবেন। শায়খ আলবানি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এ হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।

এ রাতের রোজা
শাবান মাসের ১৪ তারিখ রাতে ইবাদত বন্দেগির পর রোজা পালন প্রসঙ্গে এক হাদিসে এসেছে-
হজরত আলি ইবনে আবু তালেব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘পনের শাবানের রাতে (১৪ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোজা রাখ। কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে আসেন এবং বলেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। আছে কি কোনো রিযিকপ্রার্থী? আমি তাকে রিযিক দেব। এভাবে সুবহে সাদেক পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা ডাকতে থাকেন।’ (ইবনে মাজাহ)

হাদিসটিকে কেউ কেউ জয়ীফ বা দুর্বল বলেছেন আবার কেউ কেউ এটিকে মওজু (চরম দুর্বল বা ভ্রান্ত) বলেছেন। অনেক ইসলামিক স্কলার এ দিন রোজা রাখাকে মাসনুন বলেছেন আবার অনেকেই মোস্তাহাব বলেছেন।

উল্লেখ্য যে, অনেকে আবার এ দিন উপলক্ষে রোজা পালনকে সুন্নত বলেন। প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার আল্লামা তকি ওসমানির ইসলাহি খুতবায় এ হাদিসকে জয়ীফ বলা হয়েছে আর এ দিনের রোজাকে ‘সুন্নাত’ মনে করাকে ভুল বলা হয়েছে।

রোজা সম্পর্কিত হাদিসটির সনদ দুর্বল হোক আর অতি দুর্বল হোক কিংবা ভ্রান্ত হোক, যারা আইয়ামে বীজের রোজা পালন করেন অর্থাৎ প্রত্যেক আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখেন তাদের রোজা রাখতে বাধা নেই।

এ রাতে কবর জিয়ারত
হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত কোনো এক রাতে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে না পেয়ে খোঁজ নিতে বের হলাম এবং (জান্নাতুল) বাকিতে গিয়ে তাঁর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করছিলেন।

তিনি আমাকে বললেন, হে আয়েশা! তোমার মনে কি ভয় হচ্ছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তোমার প্রতি জুলুম করবেন?
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি মনে করেছিলাম আপনি হয়তো অন্য কোনো বিবির ঘরে তাশরিফ নিয়েছেন।
তখন প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ শাবান মাসের মধ্য রাতে (১৪ শাবান দিবাগত রাতে) দুনিয়ার আসমানে আসেন এবং বনি-কলবের (কলব গোত্রের) বকরিগুলো পশমের চেয়েও বেশি গোনাহগারকে ক্ষমা করে দেন।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ)

এ হাদিসটিকেও সনদের ব্যাপারে দুর্বল বলা হয়েছে। অনেকে একে ভ্রান্ত বলেছেন। একান্তই যদি কেউ এ রাতে কবর জিয়ারত করতে চায় তার উচিত একাকি জিয়ারত করা। কেননা প্রিয় নবি একাকি কবর জিয়ারতে গিয়েছেন বলেই হাদিসে উল্লেখ হয়েছে।

আবার অন্য হাদিসে হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘জিবরিল আলাইহিস সালাম আমার কাছে এসেছিলেন এবং বললেন, আপনার প্রভু আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন (জান্নাতুল) বাকিতে যাওয়ার জন্য এবং তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য।’ (মুসলিম)

সুতরাং শবে বরাতে রোজা ও কবর জিয়ারতসহ নানা বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি করে ফেতনা ছড়ানো একেবারেই অবান্তর। নিসফা শাবান যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ রাত। সেহেতু এ রাতে আয়োজন ছাড়া একাকি ইবাদত-বন্দেগি, নফল নামাজ, জিকির-আজকার- এর মাধ্যমে অতিবাহিত করাই শ্রেয়। তাই-

> আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া (নিজ ঘরে) রাত জেগে ইবাদাত করা। তা হতে পারে- নফল নামাজ, জিকির-আজকার, কুরআন তেলাওয়াত ও তাওবা-ইস্তিগফার ইত্যাদি। রোজা ও কবর জিয়ারত ছাড়াও হাদিসে এসেছে-
‘এ রাতে সূর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং ফজর পর্যন্ত মানুষকে তাঁর কাছে ক্ষমা, রোগ মুক্তি, জাহান্নাম থেকে মুক্তি, রিজিকসহ ইত্যাদি বৈধ প্রয়োজনীয় চাহিদার জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে আহ্বান করতে থাকেন।’

> যারা বর্ণিত হাদিসগুলোকে (জয়ীফ) দুর্বল কিংবা (মওজু) অতি দুর্বল বা ভ্রান্ত মনে করেন, তারা রোজা না রাখলেও যারা নিয়মিত আরবি মাসের আইয়ামে বীজের রোজা পালন করেন তারা যথারীতি রোজা পালন করবেন।

> আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই একাকি জাঁকজমকবিহীন কবর জিয়ারত করা যেতে পারে। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাউকে না জানিয়ে একাকি জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে কবর জিয়ারাত করেছিলেন। এমনকি যা তিনি হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকেও জানাননি।

কবর জিয়ারতের হাদিসটি জয়ীফ কিংবা মওজু যা-ই হোক; যারা যে বিশ্বাস লালন করেন, সেভাবে আমল করেন। কিন্তু কবর জিয়ারত করাই যাবে না কিংবা করতেই হবে এর কোনোটিই ফেতনা ছাড়া ইসলামের জন্য কল্যাণজনক নয়।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে শবে বরাত নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি থেকে হেফাজত করুন। হালুয়া-রুটি, গোসল করা, আলোক সজ্জাসহ সব ধরনের রুসম রেওয়াজ থেকে হেফাজত থাকার তাওফিক দান করুন। পক্ষে-বিপক্ষে সব ধরনের বিতর্ক থেকে হেফাজত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Shares